পারভেজ আহমদ ::: লেবুজাতীয় সুগন্ধি ফল সাতকরা সিলেটের ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। বিশেষ করে গরু বা খাসির মাংস রান্নায় সাতকরার অনন্য স্বাদ ও ঘ্রাণ ভোজনরসিকদের কাছে এটিকে করে তুলেছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলেটে আসা পর্যটক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের খাবারের তালিকাতেও সাতকরা দিয়ে রান্না করা গরুর মাংস থাকে পছন্দের শীর্ষে।
তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য, সিলেটের পরিচিত এই ফলের বাজার এখন পুরোপুরি ভারতীয় আমদানির ওপর নির্ভরশীল। একসময় সিলেট অঞ্চলে সাতকরার গাছ ও বাগান থাকলেও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির জন্যও ভারত থেকেই সাতকরা আমদানি করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে শুধুমাত্র সিলেট জেলায় মাত্র ১ হেক্টর জমিতে সাতকরার আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ মেট্রিক টন। বিভাগের অর্ধশতাধিক কৃষিপণ্যের তালিকায়ও সাতকরার উপস্থিতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
একসময় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ‘সাতকরাকান্দি’ গ্রাম সাতকরার জন্য সুপরিচিত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি গাছ ছাড়া উল্লেখযোগ্য উৎপাদন আর নেই।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বিভিন্ন রোগবালাই এবং কৃষকদের অনাগ্রহের কারণে সিলেটে সাতকরার বাণিজ্যিক চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশের বাজার এখন ভারতীয় সাতকরার ওপরই নির্ভরশীল। এসব সাতকরার একটি অংশ আবার ‘সিলেটি সাতকরা’ নামে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
এদিকে গত বছরের লোকসানের প্রভাব পড়েছে চলতি মৌসুমের আমদানিতেও। সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, আম্বরখানা ও কদমতলী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে সাতকরার সরবরাহ খুবই কম। যে কয়েকটি পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর বেশিরভাগই ছোট আকারের এবং পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। মানভেদে প্রতিটি সাতকরা ৪০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি দাম রাখা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত কোরবানির ঈদের আগে ভারতের আসাম ও মেঘালয় থেকে বিপুল পরিমাণ সাতকরা আমদানি হয়। কিন্তু এবার আমদানি কম হওয়ায় বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে।
বন্দরবাজারের ব্যবসায়ী মোসাইদ আলী বলেন, “ঈদের সময় সাতকরার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে প্রবাসীরা দেশে এসে বেশি কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এবার বাজারে পর্যাপ্ত সাতকরা নেই।
কদমতলী ফল বাজারের পাইকারি বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, বর্তমানে ভারত থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বস্তা সাতকরা আমদানি হচ্ছে। তবে প্রতি কেজিতে ৭৬ টাকা সরকারি করসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবুও সিলেটের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই অনেকেই এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাতকরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. নাজমুল আলম লিজন বলেন, “সিলেটে এখন আর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সাতকরা উৎপাদন হয় না। ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকাতেই মূলত সাতকরা জন্মে। সেখান থেকেই আমরা আমদানি করি। লোকসানের কারণে আগে যেখানে ৪-৫ জন আমদানিকারক ছিলেন, এখন এক-দুইজন ছাড়া প্রায় সবাই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।
সিলেটের খাদিমনগর হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রকিবুল ইসলাম রুমন বলেন, “সিলেটে যে সাতকরা পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই ভারত থেকে আমদানি করা। জকিগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের করিমগঞ্জে প্রচুর সাতকরার বাগান থাকলেও সিলেটে তেমন কোনো বাণিজ্যিক বাগান নেই। তাই সাতকরাকে সিলেটের নিজস্ব পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি জানান, জৈন্তাপুরের সাইট্রাস রিসার্চ ইনস্টিটিউট সাতকরা নিয়ে গবেষণা করছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কিছু গাছ লাগানো হলেও সেগুলোর বৃদ্ধি ধীরগতির এবং এখনও ফল আসেনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন খান বলেন, “একসময় সাতকরা সিলেটের গর্ব ছিল। কিন্তু এখন এর বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রায় নেই। বর্তমানে বাজারের চাহিদা ভারতীয় সাতকরার মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। সেই সাতকরারই একটি অংশ ‘সিলেটি সাতকরা’ নামে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।”
একসময় সিলেটের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল সাতকরা। অথচ আজ সেই ঐতিহ্যের ফলই স্থানীয় উৎপাদনের অভাবে সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। কৃষিবিদদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
Leave a Reply